মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

পুরাকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

পঞ্চগড় জেলার সৃষ্টিঃ

 

১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারী তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ- এ ৫টি উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড় জেলার সৃষ্টি হয়। এ জেলার আয়তন ১,৪০৪.৬২ বর্গ কিঃমিঃ। এ জেলার তিনদিকেই সীমামত্ম। এ সীমান্ত অঞ্চল ১৮০ কিলোমিটার বিসত্মৃত। ১৯৪৭ সালের পুর্ব পর্যন্ত  ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত এবং বর্তমান পুর্নিয়া, পশ্চিম দিনাজপুর, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহার জেলা পরিবেষ্টিত পঞ্চগড় জেলা। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়।

 

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টঃ

 

হিমালয়ের কোলঘেঁষে বাংলাদেশের সর্বোত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া। এই উপজেলার ১নং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট।

 

মহারাজার দিঘীঃ

 

রাজপ্রাসাদের সন্নিকটে ছিল একটি বড় পুকুর বর্তমানে যা ’মহারাজার দিঘী’ নামে পরিচিত। ’মহারাজার দিঘী’ একটি বিশালায়তনের জলাশয়। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০X৪০০ গজ। পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। জলভাগের আয়তন প্রায় ৪০০X২০০ গজ।

 

পানির গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট বলে স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস। পানি অতি স্বচ্ছ। দিঘীতে রয়েছে মোট ১০টি ঘাট। ধারণা করা হয় পৃথূ রাজা এই দিঘীটি খনন করেন। কথিত আছে পৃথু রাজা  পরিবার-পরিজন ও ধনরত্ন সহ ‘‘কীচক’’ নামক এক নিম্ন শ্রেণীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে তাদের সংস্পর্শে ধর্ম নাশের ভয়ে উক্ত দিঘীতে আত্মহনন করেন। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে উক্ত দিঘীর পাড়ে মেলা বসে। উক্ত মেলায় কোন কোন বার ভারতীয় লোকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

 

ভিতরগড়ঃ

 

          নামকরণ নিয়ে বহু ধরনের মতামত থাকলেও পঞ্চগড় নামটির উৎপত্তি যে এ অঞ্চলের প্রধান পাঁচটি গড়ের স্মৃতিকে ধারণ করে এটি প্রায় নিশ্চিত। গড় গুলো হলো- ভিতরগড়, মিরগড়, হোসেনদিঘিরগড়, রাজনগড়, ও দেবেনগড়। পঞ্চগড় শহর থেকে ১০ মাইল উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমামত বরাবর পঞ্চগড় সদর উপজেলাধীন অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত এই গড়। প্রাচীনকালে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পঞ্চগড়ের ’ভিতরগড়’ উল্লেখযোগ্য। আয়তনের দিক থেকে ’ভিতরগড়’ দূর্গনগরী ছিল বাংলাদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ। প্রায় ১২ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ভিতরগড়ের অবস্থান।

  

মিরগড়ঃ


  

 

মিরগড় এর কিছু অংশ এবং হোসেনগড় বর্তমানে ভারতীয় ভূ-খন্ডে চলে গেছে। মিরগড়ের অবশিষ্ট অংশ এবং রাজনগর ও দেবেনগড় বিলুপ্তপ্রায়।

 

 

 

বদেশ্বরী মন্দিরঃ 

 

বদেশ্বরী মন্দিরটি পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের দেঃ ভিঃ বদেশ্বরী মৌজার  প্রায় ২.৭৮ একর জমিতে (মন্দির ও পার্শবর্তী অংশসহ) অবস্থিত। হিন্দু ধর্মের ১৮টি পুরাণের মধ্যে স্কন্দ পুরাণ একটি। সেই স্কন্দ পুরাণে কাশি উঃ ৮৮তে বর্ণিত আছে রাজা দক্ষ একটি যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন। ভোলানাথ শিব রাজা দক্ষের জামাই ছিলেন। রাজা দক্ষ কখনই শিবকে জামাই হিসেবে মেনে নেননি। কারণ মহাবীর শিব সর্বদাই ছিলেন উদাসীন এবং নেশা ও ধ্যানগ্রস্থ। উক্ত যজ্ঞানুষ্ঠানে মুনি-ঋষিগণ ও অন্যান্য দেবতাগণ নিমন্ত্রিত হলেও রাজা দক্ষ জামাই তথা দেবী দূর্গা (পার্বতী /মহামায়া) এঁর স্বামী ভোলানাথ শিব নিমন্ত্রিত ছিলেন না। এ কথা শিবের সহধর্মিনী জানা মাত্রই ক্ষোভে দেহ ত্যাগ করেন। শিব তাঁর সহধর্মিনীর মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে উন্মাদ হয়ে তাঁর সহধর্মিনীর শব দেহটি কাঁধে নিয়ে পৃথিবীর সর্বস্তরে উন্মাদের ন্যায় ঘুরতে থাকেন এবং প্রলয়ের সৃষ্টি করেন। সে মুহূর্তে স্বর্গের রাজা বিষ্ণুদেব তা সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ হতে একটি সুদর্শনচক্র নিক্ষেপ করেন। চক্রের স্পর্শে শবদেহটি ৫২টি খন্ডে বিভক্ত হয়। শবের ৫২টি খন্ডের মধ্যে বাংলাদেশে পড়ে ০২টি খন্ড। একটি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে এবং অপরটি পঞ্চগড় এর বদেশ্বরীতে। মহামায়ার  খন্ডিত অংশ যে স্থানে পড়েছে তাকে পীঠ বলা হয়। বদেশ্বরী মহাপীঠ এরই একটি। উক্ত মন্দিরের নাম অনুযায়ী বোদা উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দিরটি এখনও প্রত্নতাত্বিক ঐতিহ্যের নিদর্শন বহন করে।

 

মির্জাপুর শাহী মসজিদঃ

 

মির্জাপুর শাহী মসজিদটি পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (সম্ভাব্য) নির্মিত ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে অবস্থিত মসজিদের সাথে মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মান শৈলীর সাদৃশ্য রয়েছে।

 

এ থেকে ধারণা করা হয় ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে অবস্থিত মসজিদের সম সাময়িক কালে এই মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়। দোস্ত মোহম্মদ নামে এক ব্যক্তি এটির নির্মান কাজ শেষ করেন মর্মে জানা যায়। মসজিদের নির্মান সম্পর্কে পারস্য ভাষায় লিখিত একটি ফলক রয়েছে মধ্যবর্তি দরজার উপরিভাগে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী ধারণা করা হয় মোঘল সম্রা্ট শাহ আলমের রাজত্বকালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটির দেওয়ালের টেরাকোট ফুল এবং লতাপাতার নক্সা খোদায় করা আছে। মসজিদটির দৈঘ্য ৪০ ফুট প্রস্থ-২৫ ফুট এবং এক সারিতে ০৩ (তিন) টি গম্বুজ আছে। মসজিদের নির্মান শৈলীর নিপুণতা ও কারম্নকার্যের জন্যই দর্শনার্থীদের এখনো আকৃষ্ট করে।

 

বার আউলিয়া মাজারঃ

 

বার আউলিয়া মাজারটি পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া মৌজার প্রায় ৪৭.৭৩ একর জমিতে অবস্থিত। উক্ত স্থানে ০১ টি মাদ্রাসা ও ০১ টি এতিম খানা আছে । ০২টি প্রতিষ্ঠান চলে মাজারের জমি হতে উৎপাদিত ফসলের আয় হতে।

 

জানা যায় মধ্যপ্রাচ্য হতে ১২ জন আউলিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য উক্ত স্থানে এসে বসবাস শুরু করেন। তাঁরা ইমেতকাল করলে উক্ত স্থানে তাঁদের সমাহিত করা হয়। ১২ জন আউলিয়াকে সমাহিত করায় এবং তাঁদের মাজার থাকায় এই স্থানের নাম হয় বার আউলিয়া। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ও পঞ্চগড় জেলা পরিষদের পৃষ্ঠপোষকতায় ’বার আউলিয়া মাজার’টি পাকা করা হয়। মাজার প্রাঙ্গনে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি ডাক-বাংলো রয়েছে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান হতে অগণিত ভক্তের পদচারনায় মুখরিত থাকে ওরশ মোবারকের দিনটি।

 

গোলকধাম মন্দিরঃ

 

গোলকধাম মন্দির’টি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাংগা ইউনিয়নের শালডাংগা গ্রামে অবস্থিত। মন্দিরটি ১৮৪৬ সালে নির্মিত হয়।

 

দেবীগঞ্জ উপজেলা সদর হতে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি অষ্টাদশ শতকের স্থাপত্যের একটি চমৎকার নিদর্শন। এর স্থাপত্য কৌশল গ্রীক পদ্ধতির অনুরুপ।

 

 

 

তেঁতুলিয়া ডাক-বাংলোঃ

 

পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরে একটি ঐতিহ্যবাহী ডাক-বাংলো আছে। ডাক-বাংলোটি জেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত। এর পাশাপাশি তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি পিকনিক কর্নার রয়েছে। উক্ত স্থান দুইটি পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় সৌন্দর্য বর্ধনে বেশী ভূমিকা পালন করছে। সৌন্দর্য বর্ধনে এই  স্থান দুটির সম্পর্ক যেন মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

 

মহনন্দা নদীর তীর ঘেঁষা ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন (অর্থাৎ নদী পার হলেই ভারত) সুউচ্চ গড়ের উপর সাধারণ ভূমি হতে প্রায় ১৫ হতে ২০ মিটার উঁচুতে ডাক-বাংলো এবং পিকনিক কর্নার অবস্থিত। উক্ত স্থান হতে হেমমত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য বেশ উপভোগ করা যায়। বর্ষাকালে মহনন্দা নদীতে পানি থাকলে এর দৃশ্য আরো বেশী মনোরম হয়। শীতকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটে।

 

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরঃ

 

হিমালয়ের কোলঘেঁষে বাংলাদেশের সর্বোত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া। এই উপজেলার ১নং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এই স্থানে মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমামত্ম সংলগ্ন প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। নেপালের সাথে বাংলাদেশের পণ্য বিনিময়ও সম্পাদিত হয় বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্টে। সম্প্রতি এ বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সাথে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরম্ন হয়েছে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটানের সাথেও এ বন্দরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্থলবন্দর যার মাধ্যমে তিনটি দেশের সাথে সুদৃঢ় যোগাযোগ গড়ে উঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে খুব শীঘ্রই ভারতের সাথে ইমিগ্রেশন চালু হতে যাচ্ছে। এটি চালু হলে পঞ্চগড় জেলা পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।

 

রকস্ মিউজিয়ামঃ

 

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ চত্ত্বরে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে উক্ত কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হক এর প্রচেষ্টায় রকস্ মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

উক্ত মিউজিয়ামে পঞ্চগড় জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে প্রায় ১,০০০ (এক হাজার) সংখ্যক এরও বেশী।